সাবিত্রী দাসের বার্ধক্য প্রেমের গল্প--
সাধপূরণ
কত কিছুই যে ঘটে এ সংসারে! আলো রানী কি কখনো স্বপ্নেও ভেবেছিল যে তার এই তিনকাল গিয়ে চারকাল না হোক, জীবনের পড়ন্ত বেলায় প্রেমের টানে সে কিনা এই ঘোর বর্ষায় যাচ্ছে প্রেমিকের কাছে। তাও কিনা আবার একা! রাধার অভিসারে যাওয়ার মতো মনে হতেই পারে। অভিসার ছাড়া আর কিই বা বলা যাবে!
আট বছরের নাতনীর আব্দার মেটাতে গেছিল রথের মেলায়। নাতনী রুমি পুতুল পছন্দে ব্যস্ত, হঠাৎ কিরকম চেনা চেনা ঠেকলো না! তা সেও তখন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে ,'ওমা, কতদিন পর দেখা বলোতো! ' সেই বলল, আলোরানীরও চিনতে দেরী হলো না,যদিও চেহারায় বদল ঘটেছে বিস্তর। চেহারা যতই বদলে যাক না কেন ভালোবাসার মানুষের ছবি যে আঁকা থাকে বুকের গভীরে !
তার বুকের ভেতর তখন কদম ফুলের সৌরভ, ভুলেই গেছে সে এখন দিদিমা। ঈষৎ লজ্জায় মুখখানিতে লালের আভা। ভেতরের উচ্ছ্বাসও চাপা রইলো না তার,'ওমা, ভুবন দা তুমি! তা তুমি এখানে কী করে? '
উত্তরে ভুবন জানায় সে অবসরের পর এখানেই থাকে এখন, এটা তার মামাবাড়ির গ্রাম।
আলোরানীর মনে পড়ে যায় সেই কিশোরী বেলার কথা। ভুবনরা থাকতো একটা বাড়ীর পরেই। সে আর ভুবন ছিল এক প্রাণ এক আত্মা। তারা যেন জোড় বেঁধেই এসেছে! ভুবনের মা তো সবাইকে বলেই রেখেছে-'দুটিতে ভারি ভালোবাসা! ওদের একসাথে বেঁধে রেখে দেব আমার কাছেই। '
মানুষ ভাবে এক, হয় আর!হঠাৎ করে হার্টফেল করে মারা গেলেন ভুবনের মা। ভুবনের বাবা মোটা টাকা পণ নিয়ে ভুবনের বিয়ে দিতে চাইলে,ভুবন বলে সে আলো ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না।
সেই রাতে বাপ-বেটায় তুমুল! সেই যে ভুবন গেল আর ফিরে এল না। আলোরও ড়বিয়ে হয়ে গেল, সে এখন দিদিমা। দশবছর হলো স্বামীও গত হয়েছেন।
ভুবন বলে-'আলো ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই আমাদের দেখা হয়েছে, সেদিন যা হতে পারতো আজ তো হতেই পারে। আমি চাকরী পেতেই তোমার বাবাকে বিয়ের জন্য বলতে গিয়েই শুনলাম তোমার বিয়ে। কাউকে কিছু না বলে চলে গেলাম, আজও একা! চাও যদি নূতন করে সবকিছু শুরু করা যেতেই পারে। আজও তোমার জন্য আমার রক্তে জোয়ার জাগে,তোমার ছবি আমার বুকের মাঝে।'
'সে কী করে হয়? হবার হলে তখনই তো হতো!'
'ভালো করে ভেবে দেখো একবার, এখন তো কত কিছুই হচ্ছে এরকম, চলো না ! সেরকম বলো তো আমরা অন্য কোথাও চলেই যাবো নাহয়! আর কোনো কথা নয়, দেরী করোনা লক্ষীটি।পারলে আজই চলে এসো, তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। '
অপ্রত্যাশিত এই ঘটনার জন্য আলো প্রস্তুত ছিল না, সবকিছুই কেমন যেন একটা স্বপ্নের মতো মনে হলো তার। একটা ঘোরের মধ্যে এলোমেলো পায়ে এগিয়ে চললো বাড়ীর পথে।
বাড়ী ফিরে তার বুকের ভেতর তোলপাড় চলতেই থাকে ! কে কী বলবে?মেয়েই বা কিভাবে নেবে ব্যাপারটা। সারাটা রাত দুচোখের পাতা এক হলো না, ভেবে ভেবে জেগেই কাটলো। একদিকে সমাজ-সংসার ,সংস্কার! অন্যদিকে বুভুক্ষু মনের লোভ,অনাবিল ভালোবাসা পাওয়ার লোভ। অবিমিশ্র অনুভূতি আর আকুলতার ভয়ঙ্কর টানাপোড়েনে ক্ষত বিক্ষত হতে থাকলো মন। বুকের গভীরে তাকিয়ে দেখলো সেখানে এখনো লুকিয়ে আছে এক প্রেম-পিপাসু নারীমন, যে মনের অনুভূতি গুলো উপেক্ষিতই থেকে গেছিল এ যাবৎ।স্ত্রী আর মা হয়েই কেটে গেছে জীবনের অনেকটা অংশ , আজ যে বড়ো সাধ হচ্ছে প্রেমিকা হয়ে বাঁচতে, তার ভুবনের প্রেমিকা!ভুবনের সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো এমনই কেটে যেত বাকী দিনগুলি ,ভুবন তাকে জাগিয়ে তুলেছে, জাগিয়ে তুলেছে তার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা চিরন্তনী প্রেমময়ী নারীসত্ত্বাকে যে তার দয়িতকে আগলে রাখতে পারবে শুধুমাত্র প্রেয়সী হয়েই নয়, বোনের মতো, বন্ধুর মতো, মায়ের মতো। ভুবনের জন্য বুকের মধ্যে মোচড় পড়ে। ভোর হতে তখনো খানিকটা দেরী আছে, সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে মনস্থির করে উঠে পড়ল। বেরিয়ে এলো ধীরপায়ে। কিছুটা যেতেই নামলো বৃষ্টি। নাহ কিছুতেই থামবে না সে, আর নয় অনেক হয়েছে!
ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে।
আকাশভাঙা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই চললো ভুবনের কাছে।
চড় চড় চড়াম! ভয়ঙ্কর শব্দে খুব কাছেই কোথাও বাজ পড়লো। কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই তার।
অসমাপ্ত দীর্ঘ এক পথ ধরে সে হেঁটে চলেছে, হেঁটে চলেছে, হেঁটেই চলেছে......
1 comment:
জীবনের বাস্তব কে ধরে রাখার মধ্যে দিয়ে লেখিকা তার গল্প লিখে গেছেন। চাওয়া-পাওয়ার অপূর্ণতাকে অনেক সময় কল্পনায় ভরিয়ে তুলে পেছনে ফেলা জীবনকে আবার খুঁজে ফেরার চেষ্টা করি। খুব সুন্দর লেগেছে গল্পটি।
Post a Comment