সম্পাদকের কলমে: তাপসকিরণ রায়--

প্রেম, শব্দটা জীবনের সবচে মহা মহিম শব্দ। প্রেম ছাড়া জীবন চলে না। বহুরূপী এই প্রেম গ্রহীতার ভাষাভাব অফুরান। হাজারো রঙের মধ্যে দিয়ে আমরা এর ছটা অনুভব করতেই পারি।

প্রকৃতিও বুঝি প্রেমের ডালি সাজায়--রংবাহারে সেজে ওঠে নীলাকাশ, ভোর ও সন্ধ্যা সূর্যের লালিম রশ্মি, মাটির শস্যে সবুজ-হলুদের মেলবন্ধন, বাগবাহার ফুলের মেলা। পাখ পাখালির চহল-পহল, মাটির সোঁদা গন্ধ, নবান্ন ধানের ঘ্রাণ, এ সব মিলিয়ে, ‘সে দিনের সোনা ঝরা সন্ধ্যা’র কথা কে ভুলতে পারে !

এক টুকরো হলুদ রোদে মেখে থাকে মায়াকায়ার কামনা বাসনা। এ সব কিছুর ছোঁয়ায় তৈরী হয়ে যাচ্ছে প্রেমের ভাষা। 'ভালবাসি ভালবাসি', বসন্তের পলাশে, শিশির শেফালির ধারাপাতে বুঝি আলাপিত হয়ে যায়। আমি আছি, তাই তুমি আছো। আমার জন্যে রাখা আছে কোন রাজকন্যা। আর তোমার জন্যে রাজপুত্র। কাঠ কয়লায় পোড়া হোক না কোন দীন মজদুর, সেও কিন্তু একক এক নায়ক। কোন কাঙ্গালিনী দিন ভর অপেক্ষায় বসে থাকে তার। সেও এক মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়েছে ! তার মধ্যেও যে আছে স্নেহ মেহ মোহ প্রেম ভালবাসা। এই সব কিছুর মধ্যে দিয়েই জীবন সতত উৎফুল্লিত হয়ে ওঠে। পুরুষ্ট মনের আবেদন নিবেদনের স্ফূর্তি জেগে থাকে। এই লাল মাটির পথ ধরে বাউল হেঁটে চলে, মুখে তার লেগে থাকে জীবনের টানাপোড়েন গান। সুখ দুঃখ বিরহের সে গান আকাশে-বাতাসে ভেসে যায়। দেহাতী বুনো গন্ধে শরীর জেগে ওঠে, কামনার ঢেউ ওঠে পদ্মকোরকে।

প্রেম অনন্ত আবার সীমায়িত, প্রেম বিরহের বন্দিঘর। প্রেম মুক্ত, প্রেম মৌসুমী, ছলনাময়ী। বয়স ধর্মের আওতার বাইরে কখনো সে হয়ে ওঠে কালাতীত। এখানে জাতপাত নেই, অন্ধ হলেও কখনও হিংস্র। কখনো নিষ্কাম প্রকৃতিতে মাঝে খেলা খেলা চলতেই থাকে। আবার সে খেলা কখনো রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। প্রেম সংজ্ঞাহীন অথবা বলা যায় প্রেমের কোন সংজ্ঞা নেই। প্রেম শুধুমাত্র মনের নয়, শরীরেরও বটে।

জীবনে প্রেম এক প্রধান বিন্দু। একাধারে চঞ্চল, ক্ষণস্থায়ী আবার অনন্ত ও সীমাহীন। প্রকৃতি স্পর্শে এসে যেমন এই প্রেম মাটি হাওয়া জলের সংস্পর্শে জেগে ওঠে মহীরুহ তেমনি এই লালন-পালন সোহাগ ভালোবাসা স্নেহ সব মিলেমিশে শেষ পর্যন্ত সৃষ্ট হয় এক প্রাণ। আসলে প্রাণের সৃষ্টি প্রেমের সান্নিধ্যে প্ৰসস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এখানে প্রেম ভালোবাসা স্নেহ মেহমোহ আকর্ষণ বিকর্ষণ এ সব কিছুই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। প্রেমের মোহমেহে একটা মেয়ে মা'য়ে রূপান্তরিত হয়। সেই মা'য়ের থেকেই সৃষ্টি হয় সন্তান। এমনি প্রেম-ভালোবাসা সূত্রেই বাধা সমস্ত পৃথিবী, বেঁচে থাকার আশে সর্বদা ঘুরে ফিরে আসে জীবনের সেই উৎস ও উপসর্গগুলি--মোহমেহ স্নেহ প্রেম ভালোবাসা।

এবার আমাদের বর্ণালোক দ্বিমাসিক ব্লগ পত্রিকা ছিল পূর্ণত বিষয়ভিত্তিক। এই সংখ্যাটি নির্দিষ্ট ভাবে আধারিত ছিল প্রেমের বিভিন্ন ধারার ওপর। লেখক লেখিকাদের কাছ থেকে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। এ ব্যাপারে পাঠকও নিরপেক্ষ মতামত দিয়ে আমাদের আরও সমৃদ্ধ করুন।


সম্পাদকের কলমে: শমিত কর্মকার--

মানুষের ব্যাপ্তি যেমন সর্বত্র। কেউ কবিতাকে ভালোবাসে আবার কিছু সংখ্যক মানুষ গল্প ভালোবাসে। তাই লেখক লেখিকারা এখন সর্বত্রই বিরাজমান। পাঠকদের উপরে লেখকের সাফল্য নির্ভর করে। একজন পাঠকই একজন লেখককে খুব করে চিনতে পারে। তাই লেখকের কাছে পাঠকরাই সম্পদ। আমরা তাই সবাইকে চাই। আমরা তাই প্রত্যেক সংখ্যায় বলছি, আপনারা বিশেষ করে পাঠকরা কিছু মতামত দিন। শুধুমাত্র লাইক নয়। ভালোকে ভালো, খারাপকে নির্দ্বিধায় খারাপ বলুন। আপনারা, লেখক পাঠক নির্বিশেষে সবাই আরও বেশি বেশি লেখা পাঠান। সম্পাদক চাইছেন ওয়েব থেকে লেখা নিয়ে তাকে ছাপার অক্ষরে রূপ দিতে। কিন্তু সেটা করতে আমাদের আরও সময় লাগবে। আপনারা আমাদের সাথে থাকলে সহযোগিতার হাত বাড়ালে নিশ্চিত সেটা আমরা পারব।

সম্পাদকের কলমে: সাবিত্রী দাস--

"লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে

রাখনু তবু হিয়ে জুড়ন না গেল। "

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের নিদর্শন তো রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা। সে প্রেমের মহাকাব্য তো প্রতিটি মানুষের প্রাণের মাঝে অনুরণিত হয়ে আসছে আবহমানের চিরন্তন সত্য হিসাবে। প্রেমের পাত্র পাত্রী অর্থাৎ নায়ক নায়িকার মনোভাব ঠিক কেমন! প্রেমের স্বরূপটিই বা কেমন জানতে গেলে বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তাদের কথাই সর্বাগ্রে মনে পড়ে।

উপরোক্ত পদ বিদ্যাপতির রচনা। নবোদ্গমের কিশলয় যেন সেই প্রেম, হাস্যকৌতুকে, লাস্যে, আবেশ মূর্চ্ছনায় সেই প্রেম আনন্দোচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ, প্রেমের হিল্লোলে শিহরিত তনু মন নব নব সুখ- মূর্চ্ছনায় মুখরিত !

তাহলে প্রেম কী শুধুমাত্র সুখের পরশপাথর ছুঁয়ে বসলো আর সব আলোয় আলোময় ! দুঃখ নাই বেদনা নাই, নাই কোন সন্তাপ।

যদি তাই সত্য হয় তবে এ আক্ষেপ কেন! কেন মনে অতৃপ্তির হাহাকার ! এত উন্মাদনা, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলনের পরেও হৃদয় জ্বালা জুড়িয়ে যাচ্ছে না কেন ! এতকিছুর পরও গভীর অতৃপ্তির সঞ্চার অনুভূত হয় কেন !

প্রেম তাহলে কী?

বড়ো রহস্যময় আর গভীর এ প্রশ্ন থেকেই যায়। মানব মনের চিরন্তন ভাবনায় উদ্বেলিত হৃদয়, প্রেম কে কখনো স্বর্গীয় ভেবেছে, কখনো আবার প্রেমকে নিয়ে এসেছে আপন অঙ্গনে। মনের মাধুরী মিশিয়ে নিবিড় প্রেম দিয়ে রচনা করেছে আপন স্বর্গ। সুখ খুঁজে পেতে চেয়েছে সেই স্বর্গে।

প্রেম তাহলে কী !

সাধারণ ভাবে নরনারীর প্রেমের কথাই যদি ধরা যায়, পরস্পরের প্রতি ভালোলাগা আর ভালোবাসা বুকের ভেতর যে আলোড়ন সৃষ্টি করে সেটাই হয়তো প্রেম ! সহ্য হয় না ভৌগোলিক দূরত্বের সীমা। বেদনা দীর্ণ অন্তরে অনুভূত যাতনা, বিরহ বেদনা মানুষকে আকুল করে তোলে। বিরহ ব্যাকুল সন্তপ্ত হৃদয় আপন করে কাছে পেতে চায় দয়িত বা দয়িতাকে, এটাই স্বাভাবিক জীবনে ঘটে থাকে। তাহলে প্রেম পূর্ণতা পেল বলা যেতেই পারে।

'প্রেম অবিনশ্বর, প্রেম অক্ষয় অব্যয়, প্রেম অজেয়, প্রেম অমর।'

অথচ বাস্তব জীবনের চাওয়া পাওয়ার ঠুনকো আঘাতে চূরমার হয়ে ভেঙে যাচ্ছে সাধের সেই প্রেমময় স্বর্গ। সব ক্ষেত্রে হয়তো নয় তবুও অনিবার্য বিচ্ছেদের পরাকাষ্ঠা ছাড়িয়ে যাচ্ছে পরিসংখ্যান ।

প্রেমের বিরহ মিলন নিয়ে রচিত হয়েছে কতনা কাব্যগাথা, কত কাব্যিক উপমার ব্যবহার ছড়ানো বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তাদের সময় থেকে আজও অব্যাহত।

আধুনিক বিজ্ঞান বলে মানুষের প্রেমানুভূতির জন্য দায়ী কতকগুলো বিশেষ রাসায়নিক। পিটুইটারি গ্রন্থির থেকে উৎপন্ন ডোপামিন নামক রাসায়নিক যার প্রভাবে প্রেমে পড়ার যাবতীয় আনুষঙ্গিক ঘটনা ঘটে থাকে। এর সঙ্গে সহযোগিতা করতে থাকে অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিন নামক হরমোন গুলি। এই রাসায়নিক গুলির প্রভাবেই প্রেমের আবেগ অনুভূতি, আকুলতা, তীব্র মিলনেচ্ছা প্রকাশ পায়।

আবার এই হরমোন লেভেলের প্রাবল্য কমতে থাকলে প্রেমের অনুভূতি আকুলতাও কমতে থাকে ক্রমশ। এখানেও কাজ করে যে রাসায়নিকের ম্যাজিক তার নাম এণ্ডোরফিন। এই রাসায়নিকটি সন্তুষ্টি লাভের জন্য দায়ী। মন কানায় কানায় পূর্ণ করে দেওয়ার কাজটি করে থাকে এই হরমোন। এই পর্যায়ে তাই প্রেমের তীব্র আবেগ প্রশমিত, স্থির শান্ত জীবনের পরিপূর্ণ প্রশান্তি।

আসে পারস্পরিক নির্ভর শীলতা যা তৈরী হয় মূলত একসঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করার কারণে। তখন গড়ে ওঠে এক সহমর্মিতার মনোভাব বা সম্পর্ক। দায়িত্ব আর কর্তব্য পালনের দায়বদ্ধতা।

এসব বিশদে বলতে গেলে বিশাল এক অধ্যায়।

বিজ্ঞান যাই ব্যাখ্যা করুক না কেন, প্রেমে পড়তে প্রেমের প্রাসাদ গড়তে কিংবা প্রেমের কবিতা আর গল্প লিখতে বাদ সাধেনি যখন প্রেমের গল্পই না হয় হোক না কেন আজকের প্রধান উপজীব্য ।


Sunday, 7 March 2021

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

                                                    

ওগো কাঙাল আমার

                                  *********************

                               শ্যামাপ্রসাদ সরকার


                                         (১)

সারাটা সকাল অপেক্ষা করেই কাটল বনানীর। রবিবার করে হিমাংশুর পথ চেয়ে থাকাটা গত আট বছরের অভ্যাস। এই অপেক্ষাটুকুই রয়ে গেছে শুধু, নিজের করে পাওয়াটুকু মনে হয় বাকিই রয়ে যাবে। 

রমেন যখন পাঁচ বছরের বিবাহিত সম্পর্কের ইতি টেনে চলে যায় বনানী তখন সবে আঠাশ পার করেছে। ওদের একমাত্র ছেলে বুবুন অটিজমে আক্রান্ত। মনোবিকাশ কেন্দ্রে ছেলের চিকিৎসা, সংসার সব কিছু একা হাতে সামলাতে তখন হিমসিম খাচ্ছে সে। তখনই হিমাংশুদের অফিসে রিসেপশনিষ্টের কাজটা পায়। হিমাংশুও তখন ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে একটা ব্যর্থ দাম্পত্যের বোঝা বইতে বইতে। ওরও একটা বারান্দার দরকার ছিল যেখানে একবার নিভৃতিতে নিঃশ্বাস নিতে পারে দিনান্তে। বনানীর তরফে এই সম্পর্কটায় প্রথম প্রথম সায় ছিল না মোটেও। ঘরপোড়া নিজেই, নেহাত চাকরিটা না থাকলে ছেলের খরচ যোগানো মুশকিল, তাই চাকরি করতে আসা। রমেন অবশ্য কিছুদিন পাঁচহাজার করে পাঠিয়েছিল। নিজে নতুন বিয়ে করে সেও যখন আবার  সংসার পাতলো বসিরহাটে, তখন থেকে সেটুকু সম্বন্ধও ঘুচল। ওর মামারা বাপ মা মরা ভাগ্নীর বিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে নিয়েছিল, কাজেই আক্ষরিক অর্থেই বনানীর দাঁড়ানোর আর কোনো জায়গা ছিলনা। আসলে ছেলেটা  অমন হওয়ায় রমেন ওকেই বরাবর দোষ দিত। ওর ধারণা ছিল বনানীদের পরিবারের জিনের কোনো খুঁতের জন্যই বুবুনটা এরকম প্রতিবন্ধী হল। রমেন ছেলেকে দুচক্ষে দেখতে পারতো না প্রথম থেকেই । শেষের দিকে তো ও আলাদা বিছানায় ছেলেকে নিয়ে শুত।

হিমাংশুর স্ত্রী স্কিৎসোফ্রেনিক। সবসময় অন্য একটা অদ্ভূত ঘোরে থাকে। প্রথমটায় অবশ্য এমন ছিলনা। দুবার মিসক্যারেজ হবার পর থেকে একটা ফ্রিজিডিটি ওকে আস্তে আস্তে ঘিরতে থাকে। ক্রমশঃ হিমাংশুকে আর সহ্য করতে পারতো না। খুব ভায়োলেন্ট হয়ে যেত। জিনিস পত্র ভাঙচুর করতে গিয়ে আহত হয়েছে কতবার ! সুইসাইড এ্যটেম্প্ট পর্যন্ত করেছে।  একটা হোমে রেখে আটবছর হল ওর চিকিৎসা করায় হিমাংশু। এই অবস্থায় ডিভোর্স করাটা খুব অমানবিক দেখাবে, তাই মালবিকাকে ছেড়ে বের হতে পারেনি যেমন, তেমন বনানীকেও অমর্যাদা করতে পারেনি। ভালবাসার কাছে ও অনুগত। কিন্তু মালবিকার জীবদ্দশায় ওর ফ্ল্যাটে বনানীকে রেখে ওকে অপমান করতে ওর বাধে। তাই রোববার সারাটা দিন বনানীর কাছে ও এসে থাকে। বনানীর খরচাপাতিও ওই দেয় আজকাল। তবুও কোথাও একটা অদৃশ্য কাঁটা বিঁধেই থাকে। বনানী আর হিমাংশু এখন আর এক অফিসে চাকরি করেনা অবশ্য। চাকরি ছেড়ে হিমাংশু এখন কন্ট্রাকটরির কাজ শুরু করেছে পার্টনারশিপে। শহরতলির দু একটা মাঝারিমাপের প্রোজেক্টের কাজ জোরকদমে চলছে এখন।

মাছের মাথা দিয়ে সোনামুগের ডাল হিমাংশুর প্রিয় বলে আজ বানিয়েছিল বনানী। সঙ্গে আলুপোস্ত আর কাটাপোনার ঝোল। বাজারটা নিজেই করতে ভালবাসে ও। সপ্তাহান্তে একটা দিন মানুষটাকে একটু ভালো রান্না করে খাওয়াতে পারলে শান্তি লাগে। কিন্তু হিমাংশু আজ এখনো এলোনা কেন? সকাল থেকেই  মোবাইলও বন্ধ আছে। এমন তো হয়না কখনোও ! বনানীর বুকের ভিতর অমঙ্গল আশঙ্কায় দুরুদুরু করে।

গতসপ্তাহে এসেছিল যখন হিমাংশু, শার্টের একখানা বোতাম ছেঁড়া দেখেছিল বনানী। এ বাড়িতে ওর দু তিন সেট কাপড় জামা থাকেই, তাই সেলাই করবে বলে সেদিন জামাটা রেখে দিয়েছিল। বোতামটা বসানোর কথা হঠাৎ মনে পড়তেই তড়িঘড়ি সেলাই এর সরঞ্জাম নিয়ে বসে পড়ে বনানী। বুবুনের খাওয়ার এখনো একটু দেরী আছে। জামাটা সযত্নে বুকের কাছে চেপে ধরে ও। একটা পুরুষালী গন্ধ রয়ে আছে ওতে। সেবার রাঁচি বেড়াতে গিয়ে ছাতিম ফুলের গন্ধে ওর একই সঙ্গে আদর আর কান্না পেয়েছিল। শার্টটায় বোতাম বসাতে বসাতে সেই আবেগঘন দুপুরটার কথা মনে পড়ে গেল হঠাৎ। 

পাড়ায় খুব একটা কারোর সাথে মেশেনা বনানী। একটা চাপা গুঞ্জন যে ওকে নিয়ে হয়; সেটা বেশ বোঝে। হিমাংশুর আসা নিয়েও যে একটা মাখো মাখো পেঁয়াজ রসুনের গন্ধওলা চর্চা চলে তাও বুঝতে অসুবিধা হয়না।  একদম সামনের ফ্ল্যাটের  শিশির রোজারিওদের বাদ দিলে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বেশী কথা বলার দরকার পড়েনা অবশ্য। 

বুবুনকে খাইয়ে দিতে হয় এখনো। সেটা সারতে সারতে আড়াইটে বাজল। হিমাংশুর ফোন এখনো বন্ধ। উৎকন্ঠাটা ক্রমশ বাড়ছে এবার। মালবিকার কিছু হলনা তো আবার ! হিমাংশু বলছিল যে প্যানক্রিয়াসের কি একটা যেন ইনফেকশনে কদিন ধরে ভুগছিল মালবিকা। হিমাংশুকে নিজের করে পাওয়ার আশা একেবারে ত্যাগ না করলেও

মালবিকার মৃত্যু কামনার কথা  কখনো কখনো যে ভাবেনি তা নয়। পরমুহূর্তেই আবার সে কথা ভেবে মা কালীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছে। নিজের কাঙালপনার মূল্যে অন্য কারোর মরণকামনা করা যে পাপ !

**********

                                             (২)


আজ রোববার হলেও সাইটে আসতে হয়েছিল।  কৈখালির প্রজেক্টটা একটা গেরোয় ফেঁসেছে। হিমাংশু আর তার পার্টনার জয়দীপ এই জটটা ছাড়াতে কাউন্সিলারের অফিসে দেখা করতে গেছিল। তাড়াহুড়োয় ফোনটা আজ ওবাড়িতে ফেলে এসেছে। দুপুর গড়িয়ে গেল, মাঝখানথেকে এখনও বনানীর সাথে একবারও কথা হলনা।

চট করে সে বাইরের কারোর ফোন থেকে বনানীকে ডায়াল করেনা। বনানীর ব্যাপারটা আজীবনের যত্নলালিত এক গোপনীয়তা যেন। এই ভীরুতা ওকেও ভাবায়। সবার চোখে ভালমানুষ হয়ে থাকার মোহতে ও ভালবাসার প্রতি অবিচার করছে যদিও।

বনানীর ছটফটানিটা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। রান্না গুলো জুড়িয়ে গেছে কখন। সে নিজেও অভুক্ত। ঘড়ির সময় একটা একটা সংখ্যার ঘর পার করে যাচ্ছে অবলীলায়।  মাথাটা টিপটিপ করে যন্ত্রণা করছে আবার। এইবার একটা ছায়ার মত অন্ধকার ঢেকে আসবে আস্তে আস্তে। হিমাংশুকে লুকিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে অবশ্য। ব্রেন টিউমার সন্দেহ করছে ডাক্তার ঘোষ। এবারে একটা সি টি স্ক্যান করার কথা। ব্যাপারটা আর লুকিয়ে রাখা যাবেনা হিমাংশুর থেকে। মাথার ভেতরের তীব্র যন্ত্রণার দপদপানিটা বাড়তে থাকে ক্রমশঃ।

সাইট থেকে বেড়িয়ে ট্যাক্সি পেতে বেশ বেগ পেতে হল আজ। এখন প্রায় এক ঘন্টা লাগবে বনানীর কাছে পৌঁছাতে। অধৈর্য হয়ে সিগারেট ধরায় হিমাংশু ট্যাক্সিতে বসে বসেই।

নিজের কিছু হলেই বুবুনের কথা সবার আগে মনে পড়ে। ও বেচারাই সবচেয়ে অসহায় এই পৃথিবীতে। সবাই এমনকি হিমাংশুও বোধহয় কাটিয়ে উঠতে পারবে  বনানীর অনুপস্থিতি কিন্তু বুবুন? ও বেচারা বোধহয় বাঁচবেই না আর ! 

অনেক দূর থেকে একটা নীলাভ আলো আসছে অন্ধকার একটা বিন্দু থেকে। অসংখ্য ধূলিকণার একটা স্তর সেই আলোর পথ জুড়ে ভাসছে। কি সুমধুর একটা শব্দ মন্দ্রিত হচ্ছে তার সঙ্গে। কত আলোর তরঙ্গ, রঙীন স্প্রেকট্রামের মত আসছে আর যাচ্ছে। বুবুন যেন অস্থির  হয়ে উঠলো একটু ! রমেন কি এখনো ওদের ভালবাসতে পারবে না ! মালবিকার ডান বুকে একটা তিল আছে না? হিমাংশু বলে

ফেলেছিল একবার! আলু পোস্তটার তলাটা ধরে গন্ধ বের হচ্ছে, পোড়া একটা ধোঁয়াটে গন্ধ। চামড়া পুড়ছে? সব পুড়ে যাচ্ছে যেন ধিকিধিকি আগুনে ! ট্যাক্সি থামল একটা যেন। অচৈতন্য হতে আর বেশী বাকী নেই।

"হিমাংশু এলে? হিমাংশু এলে? এত দেরী ! 

এত দেরী করলে কেন তুমি?"

সমাপ্ত


No comments:

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

                                                     ওগো কাঙাল আমার                                   ********...