হারিয়ে যাওয়া
সন্ধ্যা রায়
বড় বড় আম গাছ, আকাশটাকে ছেয়ে আছে, সূর্য দেখা যায় না। এই আমবাগানের নিচ থেকেই আমি রোজ এই রাস্তায় স্কুলে যাই। গা ছমছম করে, শুকনো পাতাগুলো আমাকে আরো ভয় দেখায়l পা পড়লেই মচমচ করে পাতা ভাঙ্গার শব্দ হয়। আমি ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলিl এবার কানে একটা কারো পায়ে হাঁটার শব্দ আসছে--নিশ্চয়ই কেউ আসছে l পিছনে তাকাবো না। আমিও জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করলাম l কিছুটা দূরে গিয়ে শুনলাম, আমার নাম ধরে ডাকছে, পাপিয়া--কোন মেয়ের আওয়াজ। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, তাকিয়ে দেখলাম, একটা দিদি আমায় ডাকছে, এই দিদিটাকে স্কুলে দেখেছি। দিদি কাছে এসেই বলল, চল আমিও যাবো।
আমি আর দিদি দুজনে হাঁটতে শুরু করলাম।
দিদি চলতে চলতে পড়ার কথা, ঘরের কথা সব জিজ্ঞাসা করে । আমি বলে যাই।
দিদিকে কোনদিন আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি, সাহস পায়নি । দিদি বলে, তুই খুব শান্ত, সুন্দর, মিষ্টি একটা মেয়ে, তোর আওয়াজটাও মিষ্টি--
আমি হাসলাম, মনে মনে ভাবলাম, দিদি দেখতে খুব ভালো, আওয়াজটা একটু মোটা, এ কথা ঠিক।
এমনটা একটা বছর কেটে গেলো।
দিদি দাঁড়িয়ে থাকে আমার জন্য, আমরা দুজনে মিলে একসঙ্গে স্কুলে যাই। পথে এখন আর ভয় করে না, অনেক সময় একাই যাই, ভয় পাই না । আমি আর দিদি দুজনেই খুব খুশি । দিদি জিজ্ঞেস করে, পুজোর জামা হয়েছে ?
আমি মাথা নাড়াই, বলি, আমাদের সবার জামা মা' ই শিলাই করে দেয়--
দিদি বলে, কাকিমার কাছে আমিও যাবো, শিলাই শিখবো--
আমি বললাম, এসো, মাকে তোমার কথা বলেছি, মা তোমাকে দেখলে খুশি হবে । কথা বলতে বলতে হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ পেলাম। কেউ ডাকছে, সর্বানি দিদিকে, কেউ ডাকছে দিদির নাম ধরে--
দিদির দাঁড়ালো, আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুই চিনিস ওকে ?
আমি বললাম, না
ছেলেটা আমাদের পাশে এসে বলল, আমার নাম অনির্বাণ। আমি নতুন এখানে চাকরিতে জয়েন করেছি । কাল তোমাকে হেড স্যারের ঘরে দেখেছি । তোমার নাম ধরে তিনি তোমাকে ডাকলেন তখন আমি তোমার নামটা জেনেছি।
দিদিকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি সময় লাগবে দিদিভাই?
দিদি বলল, একটু দাঁড়া, আমিও আসছি। ওই ছেলেটাকে দিদি বলল, কাল হেড স্যারের ঘরে গিয়েছিলাম, একটা চিঠি পিয়ন ভুলে আমাদের ঘরে দিয়ে গিয়েছিল। দিদির সঙ্গে আরো দু কথা বিনিময়।
আমরা তিনজন কিছু সময় চুপচাপ স্কুলের দিকে হেঁটে চলেছি। মনে ভাবলাম, লোকটার অফিস অন্যদিকে তবে আমাদের সঙ্গে কেন যাচ্ছে ? খানিক ক্ষণ কোন কথা হল না, একটু পরে ছেলেটি বলল, আমি যাচ্ছি, আবার কথা হবে--সে চলে গেল।
দিদি হাসলো, বললো বাঁচা গেল--কেন এলো বললো না--এতটা এসে চলেও গেল, কি অদ্ভুত তাই না রে ?
আমি বললাম, হ্যাঁ, পরদিন আবার স্কুলের পথে দিদি আর আমি কথা বলতে বলতে চলেছি। এরই মধ্যে পাতার সড় সড় আওয়াজ হল। দিদি বলল, দেখ তো পাপিয়া, ওই ছেলেটা বোধহয় আজও আসছে তাই না--
আমি তাকিয়ে দেখে বললাম, হ্যাঁ দিদি, ও আজও আসছে ।
আমাদের কাছে এসে সে বলল, তোমাদের দেখে বের হলাম আমি-- নটায় অফিস আছে তো তাই একটু চা খেতে বেরিয়েছি--
দিদি আমার মুখের কথাটাকে কেড়ে নিয়ে বলল, কই আপনি তো আমাদের এখানে এলেন--
--হ্যাঁ মানে চা তো খাই না, একটু সিগারেট টানব আর তোমাদের সঙ্গে কথা বলব।
এমনি ভাবে আরো ছযটা মাস কেটে গেল। একদিন আমি স্কুলে যাব বলে দিদির ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, অনির্বাণদা ডাকলো আমায়, পাপিয়া, এটা তুমি সর্বানিকে দিয়ে দিও--
আমি বুঝলাম নিশ্চয়ই কোনো চিঠি হবে, তাই বললাম, আপনি দিদিভাইকে দিয়ে দেবেন--
অনির্বাণদা জোর করলে আমি বললাম, দিদি আমাকে আগেই মানা করেছে, বলেছে, কেউ জোর করে দিললেও তুই নিবি না তাই আমি নিতে পারবো না আপনি নিজে দিয়ে দেবেন--
অনির্বাণদা যথারীতি চিঠিটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন। দিদির ঘরের সামনে এলে দিদি বেরিয়ে এলো। আমরা তিনজন হাঁটছি। একটু এগিয়ে অনির্বাণদা দিদির কাছে একটা বই চাইল আর ঐ বইটাতে চিঠিটা ভরে দিল, তারপর বইটা দিদিকে ফেরত দিল। আমি এটা খেয়াল করেছি কিন্তু দিদি সেটা জানে না। আমি বিকালে স্কুল থেকে ফেরার সময় দিদিকে বলেছিলাম, অনির্বাণদা, কোন কাগজ তোমার বইয়ের ভেতরে রেখে ছিল দিদি--
পরদিন স্কুলে যেতে খুব ইচ্ছা হচ্ছিল, দিদির মুখ দেখবার জন্য মনটা কেমন ছটফট করছিল। ভেবে ছিলাম দিদির উজ্জ্বল হাসিখুশি মুখটা দেখবো আমি--খুব খুশি ছিলাম আমি। কিন্তু দিদির মুখ দেখে ভয় পেলাম, একি অবস্থা দিদির ! যেন সারারাত ঘুমায়নি, খুব কেঁদেছে। পুরো রাস্তা চুপচাপ হেঁটে গেলাম, দিদি একটাও কথা বললো না। আমিও চুপ ছিলাম,আজ অনির্বাণদা এলো না।
এমনি ভাবে অনেকদিন চলে গেল। সেদিন আমি স্কুলের পথে যাচ্ছি।
--পাপিয়া, সর্বানি কিছু বলেছে, অনির্বাণ দা বলল। আমি বললাম, না, শুনে ও চলে গেল। আমি আগে আগে যাচ্ছিলাম দিদি আমার কাছে এলো, আমরা হাঁটছি। আমি দিদিকে অনির্বাণদার কথা বললাম না। দিদিকে দেখেছি কষ্ট পেতে তাই আর সাহস করিনি।
আবার বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল। হঠাৎ অনির্বাণদাকে দেখলাম, দাদা সাধারণ ভাবে কথা বলছে। এমনি করেই চলছিল দিনগুলি। পরীক্ষার ছুটির পর আমি এইটে, দিদি টেনে। আমরা স্কুলে যাচ্ছি। দিদি যেন কারো অপেক্ষা করছে মনে হল। এমনি সময় অনির্বাণদা এল, বললো, সর্বানি আমার উত্তর চাই--
দিদি কিছুই বলল না। অনির্বাণদা চলে গেল। আমি বললাম, দিদিভাই অনির্বাণদা খুব হ্যান্ডসাম তাই না ? হাসিমুখ করে তোমার দিকে তাকায়--যাই বল দিদিভাই অনির্বাণদা খুব স্মার্ট--দূর থেকে হেঁটে আসে যেন বাংলা ছবির নায়ক, বিশ্বজিৎ--
দিদি একটাও কথা বলল না। আমি বোকার মত বলে চলেছি, এক সময় চুপ হয়ে গেলাম, এরপর অনির্বাণদা দুদিন আসেনি। সর্বানিদি বলল, অনির্বাণের বাড়ি কোথায় জানিস ?
আমি বললাম--মাঠের ওপারে থাকে, ঘর জানি না, লক্ষ্মীপুজোয় আমাদের ঘরে প্রসাদ খেতে এসেছিল তখন বলেছিল, অনির্বাণদার মা আর বোন ঘাটশিলায় থাকে--
দিদি কিছুই বলল না, স্কুল থেকে ফিরছিলাম, দিদি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল, বলতো পাপিয়া, আমাকে দেখতে কেমন ?
আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, পরশু অনির্বাণদার অনেক প্রশংসা করেছি তাই দিদি হয়ত আমাকে এমনটা বলছে। আমি হঠাৎ হেসে বললাম, দিদি তুমি খুব সুন্দর--তোমার রেজাল্ট কত ভালো হয়েছে তাই তো অনির্বাণদা তোমাকে এত পছন্দ করে--
দিদি যেন আমার কথা শুনতে পেল না। সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে মগ্ন হয়ে থাকল। আমরা ঘরে এসে গেছি। দিদি চুপ করে তার ঘরে ঢুকলো। আমিও নিজের ঘরের দিকে চললাম। ঘরে ঢুকতেই মা বলল, তোর বাবার ট্রানস্ফার হয়ে গেছে--আমরা উড়িষ্যা ছেড়ে মধ্যপ্রদেশে যাব। আমি বসে গেলাম, নিজের কথা ছেড়ে সর্বানিদির কথাই মনে পড়ল। দিদির কি হবে, আমি জানতেও পারব না। দিদি আর অনির্বাণদার বিয়ে হবে। আমি দেখতে পাবো না। পরদিন দিদিকে বললাম, দিদি তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। দিদিকে আজ সাদা শাড়িতে মা সরস্বতীর মত লাগছে কিন্তু মুখটা গম্ভীর তবুও খুব সুন্দর লাগছে। আমি বললাম, আমরা মধ্যপ্রদেশে যাচ্ছি--বাবা ট্রানস্ফার হয়ে গেছে--
আমার কথা শুনে দিদির মুখটা শুকিয়ে গেল, বলল, আমাকে ছেড়ে যাস না--আমি একা হয়ে যাব রে!
আমি বললাম, আমি কি করবো বলো, আমাকে তো যেতেই হবে--আমার নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছিল। হঠাৎ দেখতে পেলাম অনির্বাণদা ছুটতে ছুটতে আসছে--হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, সর্বানি, আমার মা বোন ঘাটশিলায় থাকে--তাই আমি সেখানে ট্রান্সফারের জন্য আবেদন করেছিলাম--হেড অফিস আমায ট্রান্সফার মঞ্জুর করে দিয়েছে--
দিদি অনেক সময় অনির্বাণের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকলো। দিদির মাথায় যেন বাজ পড়েছে, তার চোখের জল আটকে রাখতে পারল না, চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, অনির্বাণ আজ তোমাকে সব বলবো বলেই ভেবে ছিলাম। দিদি বলে চলল, আমি কি করে বুঝাবো জানি না, অনির্বাণ, তুমি আমাকে ভুল বুঝছো।
আমি এমন একটা পাতকি, আমার জন্মের পর বাবা লোকজন কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না বলে চলে আসে এই জঙ্গলে। ঠাকুমা বলেছিল, ওকে দন্ডক বনে, সীতা মায়ের দেশে নির্বাসন দিয়ে আয়। ওরা পারেনি আমাকে ছেড়ে যেতে। বাবা-মা ভয়ে অন্য কোন সন্তানের মুখ দেখেনি যাতে আমাকে নিয়ে খুব কষ্ট পেতে হয়। অনির্বাণ, তুমি যা ভাবছো আমি তা নই, আমি না স্ত্রী, না পুরুষ, এটুকু বলে দিদি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলl দিদি আর কথা বলতে পারছিল না। আমিও কাঁদছি ।
হঠাৎ অনির্বাণদা বলল, সর্বানী, আমি তোমাকে না জেনে কষ্ট দিয়েছি। আমি বুঝতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করো--দাদা আর দাঁড়ালো না, চোখে জল নিয়ে ঘরের দিকে হাঁটতে থাকল।
আমরা ঘরে ফিরে গেলাম। সেই থেকে দিদি আর স্কুলে যেত না। আমরা মধ্যপ্রদেশে চলে গেলাম। পরে একবার উড়িষ্যায় গিয়েছিলাম দিদিকে দেখবো বলে। দিদিকে দেখতে পাইনি, হয়ত ওরাও কোথাও চলে গেছে।
উদাস মনে ফিরে এসেছিলাম সে দিন। আজও জানি না, অনির্বাণদা আর সর্বানিদি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
সমাপ্ত
1 comment:
ভাষা ভাব সহজ সরল। আর এ কারণেই বোধহয় গল্পটা মনোগ্রাহী লেগেছে। আমাদের দৈনন্দিন গল্পের মত তুলে ধরা হলেও এটি একটি ব্যতিক্রমী কাহিনীর গল্প। সুখপাঠ্য সন্দেহ নেই।
Post a Comment