লাল গোলাপ ও স্বপ্নচমক
অচিনের খুব ভালো লাগছিল মেয়েটাকে।মুখের লাল মাস্ক তার থুতনির নিচে লেগেছিল। সে হাতে একটা লাল গোলাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। নিশ্চয়ই সে প্রেমিককে খুঁজে ফিরছিল। পূজা প্যান্ডেলে ভিড় না হলেও বেশ কিছু লোক এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
অচিনের খুব সুন্দর লাগছিল মেয়েটিকে। একটু বেশি প্রসাধন করা, সামান্য চাপা রঙ হলেও খুব মিষ্টি লাগছিল তাকে। অচিনের ইদানীং মেয়েদের খুব ভাল লাগে। বিয়ে করবো না করবো না করেও চল্লিশটা বছর সে অবিবাহিত জীবন পার করে দিয়েছে। তার মধ্যে একটা প্রেম গজিয়ে উঠতে উঠতে ফুটুস হয়ে গেল। প্রেমিকা, পাখি হুট করে অন্য একটা ছেলেকে বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে গেল। খুব খারাপ লেগেছিল অচিনের। তারপর থেকে মেয়েদের উপর থেকে ওর আকর্ষণ কমে যাচ্ছিল, কিন্তু সুন্দর তো সুন্দরই হয়। এই যেমন গোলাপ হাতের মেয়েটাকে খুব সুন্দরী, আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল। অচিনের মুখে মাস্ক আঁটা। পূজামণ্ডপের অনেকের মুখে মাস্ক পরা। এ জন্যে মানুষ চিনতে একটু কষ্ট হয়ে যায়, মুখের আকৃতি রেখাগুলি মাস্কের তলায় ঢাকা পড়ে। কিন্তু এই মেয়েটির মুখে কোন মাস্ক নেই। এক হাতে গোলাপটাকে উঁচিয়ে ধরে সে এগিয়ে যাচ্ছে, কাউকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
--এই তো তুমি ! কত খুঁজছি তোমায়—
অচিন এবার স্পষ্ট তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। মেয়েটা তার সামনে দাঁড়িয়ে।
--আমাকে বলছেন ?
--হ্যাঁ--তোমায় ছাড়া আর কাকে বলবো?
অচিন চিনতে পারছে না মেয়েটিকে। সে ইতস্তত করছে।
--অনীল, কি হচ্ছে কি ?
--আমি অচিন—
--ওই হল, নাও ধরো—হাতের লাল গোলাপটা মেয়েটা অচিনের দিকে এগিয়ে দিল, কি হল ধরো ?
অগত্যা হাত বাড়াল অচিন। মেয়েটা লাল গোলাপ অচিনের হাতে গুঁজে দিল। অচিনের হাত ধরে টেনে আড়ালে একটু ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো, আমি তোমায় ভালবাসি অনীল !
--আমি অচিন, বিড়বিড় করল অচিন।
--আমার অনীল হারিয়ে গেছে, জানো তো, এমনি একটা পূজার দিনে আমার অনীল হারিয়ে গেছে, আজ তোমায় পেলাম। অচিন ! নাও না তুমি আমার ভালোবাসা !
অচিন আমতা আমতা করে, ও নিজেকে এখনো স্বাভাবিক করে নিতে পারছে না। কিন্তু মেয়েটার আকর্ষণ আছে, শ্যামা রঙের মাঝে তার নাক মুখ চোখ বেশ সুন্দর, ধারালো।
--শুনছো আমার কথা ? মেয়েটা অচিনের একটা হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে যায় পূজা প্যান্ডেলের বাইরে। ওরা একটা আড়াল নিয়ে দাঁড়ায়।
--তুমি বিয়ে করেছ ?
--না—
--প্রেমিকা মরে গেছে বুঝি ?
--না, বিয়ে করে চলে গেছে। অচিনের জড়তা তখনও কাটেনি।
মেয়েটা অচিনের দুটো হাত বুকের কাছে টেনে নেয়। মাঝখানে তখনও অচিনের হাতে ধরা থাকে লাল গোলাপ। ওরা দুজনেই তার গন্ধ পাচ্ছিল, ওরা দুজনেই নাক টেনে গোলাপের গন্ধ নিচ্ছিল, আধ অন্ধকারে ওরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। অচিন জানতেও পারল না কয়েক মুহূর্তের মাঝে মেয়েটা কি ভাবে যেন তার প্রেমিকা হয়ে গেল ! ও অচিনের আরও কাছে এসে দাঁড়াল। উভয়ের শরীর স্পর্শ হচ্ছিল। পাশদিয়ে লোকজন চলে যাচ্ছিল। ওরা যেন আলো-অন্ধকারের আড়ালে, অচিন ও মেয়েটা একজন আরেক জনের গায়ে মিশে যাচ্ছিল।
মিনিট পনেরো কি ভাবে পার হয়ে গেল অচিন জানে না। হঠাৎ সে দেখল মেয়েটা নির্লিপ্ত নির্বাক হয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। জড়তা ভেঙে অচিন মেয়েটির দিকে প্রায় ছুটে এগিয়ে গেলো, পেছন থেকে ডেকে বলে উঠলো, এই তোমার নাম, মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে যাও...
মেয়েটা ততক্ষণে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেছে। অচিন হতবাক হল, চমক এক স্বপ্নের মধ্যে একি হয়ে গেল তার ? এটা স্বপ্ন, না বাস্তব ? মেয়েটার দেওয়া সে লাল গোলাপটাও যে তার হাতে নেই! একটা চুম্বনের প্রত্যাশায় মুখের মাস্কটাও কখন যেন খসে পড়েছে।
পূজা প্যান্ডেল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো অচিন। পাশের দোকানে গিয়ে সে এক প্যাকেট সিগারেট চাইল কিন্তু পকেটে হাত দিয়ে দেখল এ কি, পাঁচ শ’টাকার নোট কোথায় গেল ? না নেই, কোন পকেটেই নেই।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment