সম্পাদকের কলমে: তাপসকিরণ রায়--

প্রেম, শব্দটা জীবনের সবচে মহা মহিম শব্দ। প্রেম ছাড়া জীবন চলে না। বহুরূপী এই প্রেম গ্রহীতার ভাষাভাব অফুরান। হাজারো রঙের মধ্যে দিয়ে আমরা এর ছটা অনুভব করতেই পারি।

প্রকৃতিও বুঝি প্রেমের ডালি সাজায়--রংবাহারে সেজে ওঠে নীলাকাশ, ভোর ও সন্ধ্যা সূর্যের লালিম রশ্মি, মাটির শস্যে সবুজ-হলুদের মেলবন্ধন, বাগবাহার ফুলের মেলা। পাখ পাখালির চহল-পহল, মাটির সোঁদা গন্ধ, নবান্ন ধানের ঘ্রাণ, এ সব মিলিয়ে, ‘সে দিনের সোনা ঝরা সন্ধ্যা’র কথা কে ভুলতে পারে !

এক টুকরো হলুদ রোদে মেখে থাকে মায়াকায়ার কামনা বাসনা। এ সব কিছুর ছোঁয়ায় তৈরী হয়ে যাচ্ছে প্রেমের ভাষা। 'ভালবাসি ভালবাসি', বসন্তের পলাশে, শিশির শেফালির ধারাপাতে বুঝি আলাপিত হয়ে যায়। আমি আছি, তাই তুমি আছো। আমার জন্যে রাখা আছে কোন রাজকন্যা। আর তোমার জন্যে রাজপুত্র। কাঠ কয়লায় পোড়া হোক না কোন দীন মজদুর, সেও কিন্তু একক এক নায়ক। কোন কাঙ্গালিনী দিন ভর অপেক্ষায় বসে থাকে তার। সেও এক মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়েছে ! তার মধ্যেও যে আছে স্নেহ মেহ মোহ প্রেম ভালবাসা। এই সব কিছুর মধ্যে দিয়েই জীবন সতত উৎফুল্লিত হয়ে ওঠে। পুরুষ্ট মনের আবেদন নিবেদনের স্ফূর্তি জেগে থাকে। এই লাল মাটির পথ ধরে বাউল হেঁটে চলে, মুখে তার লেগে থাকে জীবনের টানাপোড়েন গান। সুখ দুঃখ বিরহের সে গান আকাশে-বাতাসে ভেসে যায়। দেহাতী বুনো গন্ধে শরীর জেগে ওঠে, কামনার ঢেউ ওঠে পদ্মকোরকে।

প্রেম অনন্ত আবার সীমায়িত, প্রেম বিরহের বন্দিঘর। প্রেম মুক্ত, প্রেম মৌসুমী, ছলনাময়ী। বয়স ধর্মের আওতার বাইরে কখনো সে হয়ে ওঠে কালাতীত। এখানে জাতপাত নেই, অন্ধ হলেও কখনও হিংস্র। কখনো নিষ্কাম প্রকৃতিতে মাঝে খেলা খেলা চলতেই থাকে। আবার সে খেলা কখনো রহস্যময়ী হয়ে ওঠে। প্রেম সংজ্ঞাহীন অথবা বলা যায় প্রেমের কোন সংজ্ঞা নেই। প্রেম শুধুমাত্র মনের নয়, শরীরেরও বটে।

জীবনে প্রেম এক প্রধান বিন্দু। একাধারে চঞ্চল, ক্ষণস্থায়ী আবার অনন্ত ও সীমাহীন। প্রকৃতি স্পর্শে এসে যেমন এই প্রেম মাটি হাওয়া জলের সংস্পর্শে জেগে ওঠে মহীরুহ তেমনি এই লালন-পালন সোহাগ ভালোবাসা স্নেহ সব মিলেমিশে শেষ পর্যন্ত সৃষ্ট হয় এক প্রাণ। আসলে প্রাণের সৃষ্টি প্রেমের সান্নিধ্যে প্ৰসস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এখানে প্রেম ভালোবাসা স্নেহ মেহমোহ আকর্ষণ বিকর্ষণ এ সব কিছুই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। প্রেমের মোহমেহে একটা মেয়ে মা'য়ে রূপান্তরিত হয়। সেই মা'য়ের থেকেই সৃষ্টি হয় সন্তান। এমনি প্রেম-ভালোবাসা সূত্রেই বাধা সমস্ত পৃথিবী, বেঁচে থাকার আশে সর্বদা ঘুরে ফিরে আসে জীবনের সেই উৎস ও উপসর্গগুলি--মোহমেহ স্নেহ প্রেম ভালোবাসা।

এবার আমাদের বর্ণালোক দ্বিমাসিক ব্লগ পত্রিকা ছিল পূর্ণত বিষয়ভিত্তিক। এই সংখ্যাটি নির্দিষ্ট ভাবে আধারিত ছিল প্রেমের বিভিন্ন ধারার ওপর। লেখক লেখিকাদের কাছ থেকে আমরা ভালো সাড়া পেয়েছি। এ ব্যাপারে পাঠকও নিরপেক্ষ মতামত দিয়ে আমাদের আরও সমৃদ্ধ করুন।


সম্পাদকের কলমে: শমিত কর্মকার--

মানুষের ব্যাপ্তি যেমন সর্বত্র। কেউ কবিতাকে ভালোবাসে আবার কিছু সংখ্যক মানুষ গল্প ভালোবাসে। তাই লেখক লেখিকারা এখন সর্বত্রই বিরাজমান। পাঠকদের উপরে লেখকের সাফল্য নির্ভর করে। একজন পাঠকই একজন লেখককে খুব করে চিনতে পারে। তাই লেখকের কাছে পাঠকরাই সম্পদ। আমরা তাই সবাইকে চাই। আমরা তাই প্রত্যেক সংখ্যায় বলছি, আপনারা বিশেষ করে পাঠকরা কিছু মতামত দিন। শুধুমাত্র লাইক নয়। ভালোকে ভালো, খারাপকে নির্দ্বিধায় খারাপ বলুন। আপনারা, লেখক পাঠক নির্বিশেষে সবাই আরও বেশি বেশি লেখা পাঠান। সম্পাদক চাইছেন ওয়েব থেকে লেখা নিয়ে তাকে ছাপার অক্ষরে রূপ দিতে। কিন্তু সেটা করতে আমাদের আরও সময় লাগবে। আপনারা আমাদের সাথে থাকলে সহযোগিতার হাত বাড়ালে নিশ্চিত সেটা আমরা পারব।

সম্পাদকের কলমে: সাবিত্রী দাস--

"লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে

রাখনু তবু হিয়ে জুড়ন না গেল। "

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেমের নিদর্শন তো রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা। সে প্রেমের মহাকাব্য তো প্রতিটি মানুষের প্রাণের মাঝে অনুরণিত হয়ে আসছে আবহমানের চিরন্তন সত্য হিসাবে। প্রেমের পাত্র পাত্রী অর্থাৎ নায়ক নায়িকার মনোভাব ঠিক কেমন! প্রেমের স্বরূপটিই বা কেমন জানতে গেলে বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তাদের কথাই সর্বাগ্রে মনে পড়ে।

উপরোক্ত পদ বিদ্যাপতির রচনা। নবোদ্গমের কিশলয় যেন সেই প্রেম, হাস্যকৌতুকে, লাস্যে, আবেশ মূর্চ্ছনায় সেই প্রেম আনন্দোচ্ছ্বাসে পরিপূর্ণ, প্রেমের হিল্লোলে শিহরিত তনু মন নব নব সুখ- মূর্চ্ছনায় মুখরিত !

তাহলে প্রেম কী শুধুমাত্র সুখের পরশপাথর ছুঁয়ে বসলো আর সব আলোয় আলোময় ! দুঃখ নাই বেদনা নাই, নাই কোন সন্তাপ।

যদি তাই সত্য হয় তবে এ আক্ষেপ কেন! কেন মনে অতৃপ্তির হাহাকার ! এত উন্মাদনা, হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলনের পরেও হৃদয় জ্বালা জুড়িয়ে যাচ্ছে না কেন ! এতকিছুর পরও গভীর অতৃপ্তির সঞ্চার অনুভূত হয় কেন !

প্রেম তাহলে কী?

বড়ো রহস্যময় আর গভীর এ প্রশ্ন থেকেই যায়। মানব মনের চিরন্তন ভাবনায় উদ্বেলিত হৃদয়, প্রেম কে কখনো স্বর্গীয় ভেবেছে, কখনো আবার প্রেমকে নিয়ে এসেছে আপন অঙ্গনে। মনের মাধুরী মিশিয়ে নিবিড় প্রেম দিয়ে রচনা করেছে আপন স্বর্গ। সুখ খুঁজে পেতে চেয়েছে সেই স্বর্গে।

প্রেম তাহলে কী !

সাধারণ ভাবে নরনারীর প্রেমের কথাই যদি ধরা যায়, পরস্পরের প্রতি ভালোলাগা আর ভালোবাসা বুকের ভেতর যে আলোড়ন সৃষ্টি করে সেটাই হয়তো প্রেম ! সহ্য হয় না ভৌগোলিক দূরত্বের সীমা। বেদনা দীর্ণ অন্তরে অনুভূত যাতনা, বিরহ বেদনা মানুষকে আকুল করে তোলে। বিরহ ব্যাকুল সন্তপ্ত হৃদয় আপন করে কাছে পেতে চায় দয়িত বা দয়িতাকে, এটাই স্বাভাবিক জীবনে ঘটে থাকে। তাহলে প্রেম পূর্ণতা পেল বলা যেতেই পারে।

'প্রেম অবিনশ্বর, প্রেম অক্ষয় অব্যয়, প্রেম অজেয়, প্রেম অমর।'

অথচ বাস্তব জীবনের চাওয়া পাওয়ার ঠুনকো আঘাতে চূরমার হয়ে ভেঙে যাচ্ছে সাধের সেই প্রেমময় স্বর্গ। সব ক্ষেত্রে হয়তো নয় তবুও অনিবার্য বিচ্ছেদের পরাকাষ্ঠা ছাড়িয়ে যাচ্ছে পরিসংখ্যান ।

প্রেমের বিরহ মিলন নিয়ে রচিত হয়েছে কতনা কাব্যগাথা, কত কাব্যিক উপমার ব্যবহার ছড়ানো বৈষ্ণব পদাবলীর পদকর্তাদের সময় থেকে আজও অব্যাহত।

আধুনিক বিজ্ঞান বলে মানুষের প্রেমানুভূতির জন্য দায়ী কতকগুলো বিশেষ রাসায়নিক। পিটুইটারি গ্রন্থির থেকে উৎপন্ন ডোপামিন নামক রাসায়নিক যার প্রভাবে প্রেমে পড়ার যাবতীয় আনুষঙ্গিক ঘটনা ঘটে থাকে। এর সঙ্গে সহযোগিতা করতে থাকে অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিন নামক হরমোন গুলি। এই রাসায়নিক গুলির প্রভাবেই প্রেমের আবেগ অনুভূতি, আকুলতা, তীব্র মিলনেচ্ছা প্রকাশ পায়।

আবার এই হরমোন লেভেলের প্রাবল্য কমতে থাকলে প্রেমের অনুভূতি আকুলতাও কমতে থাকে ক্রমশ। এখানেও কাজ করে যে রাসায়নিকের ম্যাজিক তার নাম এণ্ডোরফিন। এই রাসায়নিকটি সন্তুষ্টি লাভের জন্য দায়ী। মন কানায় কানায় পূর্ণ করে দেওয়ার কাজটি করে থাকে এই হরমোন। এই পর্যায়ে তাই প্রেমের তীব্র আবেগ প্রশমিত, স্থির শান্ত জীবনের পরিপূর্ণ প্রশান্তি।

আসে পারস্পরিক নির্ভর শীলতা যা তৈরী হয় মূলত একসঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করার কারণে। তখন গড়ে ওঠে এক সহমর্মিতার মনোভাব বা সম্পর্ক। দায়িত্ব আর কর্তব্য পালনের দায়বদ্ধতা।

এসব বিশদে বলতে গেলে বিশাল এক অধ্যায়।

বিজ্ঞান যাই ব্যাখ্যা করুক না কেন, প্রেমে পড়তে প্রেমের প্রাসাদ গড়তে কিংবা প্রেমের কবিতা আর গল্প লিখতে বাদ সাধেনি যখন প্রেমের গল্পই না হয় হোক না কেন আজকের প্রধান উপজীব্য ।


Sunday, 7 March 2021

সন্ধ্যা রায়

 


হারিয়ে যাওয়া

সন্ধ্যা রায়


বড় বড় আম গাছ, আকাশটাকে ছেয়ে আছে, সূর্য দেখা যায় না। এই আমবাগানের নিচ থেকেই আমি রোজ এই রাস্তায় স্কুলে যাই। গা ছমছম করে, শুকনো পাতাগুলো আমাকে আরো ভয় দেখায়l পা পড়লেই মচমচ করে পাতা ভাঙ্গার শব্দ হয়। আমি ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলিl এবার কানে একটা কারো পায়ে হাঁটার শব্দ আসছে--নিশ্চয়ই কেউ আসছে l পিছনে তাকাবো না। আমিও জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করলাম l কিছুটা দূরে গিয়ে শুনলাম, আমার নাম ধরে ডাকছে, পাপিয়া--কোন মেয়ের আওয়াজ। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম, তাকিয়ে দেখলাম, একটা দিদি আমায় ডাকছে, এই দিদিটাকে স্কুলে দেখেছি। দিদি কাছে এসেই বলল, চল আমিও যাবো। 

আমি আর দিদি দুজনে হাঁটতে শুরু করলাম। 

দিদি চলতে চলতে পড়ার কথা, ঘরের কথা সব জিজ্ঞাসা করে । আমি বলে যাই। 

দিদিকে কোনদিন আমি কিছু জিজ্ঞেস করিনি, সাহস পায়নি । দিদি বলে, তুই খুব শান্ত, সুন্দর, মিষ্টি একটা মেয়ে, তোর আওয়াজটাও মিষ্টি--

আমি হাসলাম, মনে মনে ভাবলাম, দিদি দেখতে খুব ভালো, আওয়াজটা একটু মোটা, এ কথা ঠিক। 

এমনটা একটা বছর কেটে গেলো। 

দিদি দাঁড়িয়ে থাকে আমার জন্য, আমরা দুজনে মিলে একসঙ্গে স্কুলে যাই। পথে এখন আর ভয় করে না, অনেক সময় একাই যাই, ভয় পাই না । আমি আর দিদি দুজনেই খুব খুশি । দিদি জিজ্ঞেস করে, পুজোর জামা হয়েছে ? 

আমি মাথা নাড়াই, বলি, আমাদের সবার জামা মা' ই শিলাই করে দেয়--  

দিদি বলে, কাকিমার কাছে আমিও যাবো, শিলাই শিখবো-- 

আমি বললাম, এসো, মাকে তোমার কথা বলেছি, মা তোমাকে দেখলে খুশি হবে । কথা বলতে বলতে হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ পেলাম। কেউ ডাকছে, সর্বানি দিদিকে, কেউ ডাকছে দিদির নাম ধরে-- 

দিদির দাঁড়ালো, আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, তুই চিনিস ওকে ? 

আমি বললাম, না 

ছেলেটা আমাদের পাশে এসে বলল, আমার নাম অনির্বাণ। আমি নতুন এখানে চাকরিতে জয়েন করেছি । কাল তোমাকে হেড স্যারের ঘরে দেখেছি । তোমার নাম ধরে তিনি তোমাকে ডাকলেন তখন আমি তোমার নামটা জেনেছি।

দিদিকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি সময় লাগবে দিদিভাই?

দিদি বলল, একটু দাঁড়া, আমিও আসছি। ওই ছেলেটাকে দিদি বলল, কাল হেড স্যারের ঘরে গিয়েছিলাম, একটা চিঠি পিয়ন ভুলে আমাদের ঘরে দিয়ে গিয়েছিল।  দিদির সঙ্গে আরো দু কথা বিনিময়।

আমরা তিনজন কিছু সময় চুপচাপ স্কুলের দিকে হেঁটে চলেছি। মনে ভাবলাম, লোকটার অফিস অন্যদিকে তবে আমাদের সঙ্গে কেন যাচ্ছে ? খানিক ক্ষণ কোন কথা হল না, একটু পরে ছেলেটি বলল, আমি যাচ্ছি, আবার কথা হবে--সে চলে গেল।

 দিদি হাসলো, বললো বাঁচা গেল--কেন এলো বললো না--এতটা এসে চলেও গেল, কি অদ্ভুত তাই না রে ?

আমি বললাম, হ্যাঁ, পরদিন আবার স্কুলের পথে দিদি আর আমি কথা বলতে বলতে চলেছি।  এরই মধ্যে পাতার সড় সড় আওয়াজ হল। দিদি বলল, দেখ তো পাপিয়া, ওই ছেলেটা বোধহয় আজও আসছে তাই না--

আমি তাকিয়ে দেখে বললাম, হ্যাঁ দিদি, ও আজও আসছে ।

আমাদের কাছে এসে সে বলল, তোমাদের দেখে বের হলাম আমি-- নটায় অফিস আছে তো তাই একটু চা খেতে বেরিয়েছি--

দিদি আমার মুখের কথাটাকে কেড়ে নিয়ে  বলল, কই আপনি তো আমাদের এখানে এলেন-- 

--হ্যাঁ মানে চা তো খাই না, একটু সিগারেট টানব আর তোমাদের সঙ্গে কথা বলব।  

এমনি ভাবে আরো ছযটা মাস কেটে গেল। একদিন আমি স্কুলে যাব বলে দিদির ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, অনির্বাণদা ডাকলো আমায়, পাপিয়া, এটা তুমি সর্বানিকে দিয়ে দিও-- 

আমি বুঝলাম নিশ্চয়ই কোনো চিঠি হবে,  তাই বললাম, আপনি দিদিভাইকে দিয়ে দেবেন-- 

অনির্বাণদা জোর করলে আমি বললাম, দিদি আমাকে আগেই মানা করেছে, বলেছে, কেউ জোর করে দিললেও তুই নিবি না তাই আমি নিতে পারবো না আপনি নিজে দিয়ে দেবেন-- 

অনির্বাণদা যথারীতি চিঠিটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন। দিদির ঘরের সামনে এলে দিদি বেরিয়ে এলো। আমরা তিনজন হাঁটছি। একটু এগিয়ে অনির্বাণদা দিদির কাছে একটা বই চাইল আর ঐ বইটাতে চিঠিটা ভরে দিল, তারপর বইটা দিদিকে ফেরত দিল। আমি এটা খেয়াল করেছি কিন্তু দিদি সেটা জানে না। আমি বিকালে স্কুল   থেকে ফেরার সময় দিদিকে বলেছিলাম, অনির্বাণদা, কোন কাগজ তোমার বইয়ের ভেতরে রেখে ছিল দিদি--

পরদিন স্কুলে যেতে খুব ইচ্ছা হচ্ছিল, দিদির মুখ দেখবার জন্য মনটা কেমন ছটফট করছিল। ভেবে ছিলাম দিদির উজ্জ্বল হাসিখুশি মুখটা দেখবো আমি--খুব খুশি ছিলাম আমি। কিন্তু দিদির মুখ দেখে ভয় পেলাম, একি  অবস্থা দিদির ! যেন সারারাত ঘুমায়নি, খুব কেঁদেছে। পুরো রাস্তা চুপচাপ হেঁটে গেলাম, দিদি একটাও কথা বললো না। আমিও চুপ ছিলাম,আজ অনির্বাণদা এলো না। 

এমনি ভাবে অনেকদিন চলে গেল। সেদিন আমি স্কুলের পথে যাচ্ছি। 

--পাপিয়া, সর্বানি কিছু বলেছে, অনির্বাণ দা বলল। আমি বললাম, না, শুনে ও  চলে গেল। আমি আগে আগে যাচ্ছিলাম দিদি আমার কাছে এলো, আমরা হাঁটছি। আমি দিদিকে অনির্বাণদার কথা বললাম না। দিদিকে দেখেছি কষ্ট পেতে তাই আর সাহস করিনি। 

আবার বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেল। হঠাৎ অনির্বাণদাকে দেখলাম, দাদা সাধারণ ভাবে কথা বলছে। এমনি করেই চলছিল দিনগুলি। পরীক্ষার ছুটির পর আমি এইটে, দিদি টেনে। আমরা স্কুলে যাচ্ছি। দিদি যেন কারো অপেক্ষা করছে মনে হল। এমনি সময় অনির্বাণদা এল, বললো, সর্বানি আমার উত্তর চাই-- 

দিদি কিছুই বলল না। অনির্বাণদা চলে গেল। আমি বললাম, দিদিভাই অনির্বাণদা খুব হ্যান্ডসাম তাই না ? হাসিমুখ করে তোমার দিকে তাকায়--যাই বল দিদিভাই অনির্বাণদা খুব স্মার্ট--দূর থেকে হেঁটে আসে যেন বাংলা ছবির নায়ক,  বিশ্বজিৎ--

দিদি একটাও কথা বলল না। আমি বোকার মত বলে চলেছি, এক সময় চুপ হয়ে গেলাম, এরপর অনির্বাণদা দুদিন আসেনি। সর্বানিদি বলল, অনির্বাণের বাড়ি কোথায় জানিস ? 

আমি বললাম--মাঠের ওপারে থাকে, ঘর জানি না, লক্ষ্মীপুজোয় আমাদের ঘরে প্রসাদ খেতে এসেছিল তখন বলেছিল, অনির্বাণদার মা আর বোন ঘাটশিলায় থাকে-- 

দিদি কিছুই বলল না, স্কুল থেকে ফিরছিলাম, দিদি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল, বলতো পাপিয়া, আমাকে দেখতে কেমন ? 

আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। আর মনে মনে ভাবলাম, পরশু অনির্বাণদার অনেক প্রশংসা করেছি তাই দিদি হয়ত আমাকে এমনটা বলছে। আমি হঠাৎ হেসে বললাম, দিদি তুমি খুব সুন্দর--তোমার রেজাল্ট কত ভালো হয়েছে তাই তো অনির্বাণদা তোমাকে এত পছন্দ করে-- 

দিদি যেন আমার কথা শুনতে পেল না। সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে মগ্ন হয়ে থাকল। আমরা ঘরে এসে গেছি। দিদি চুপ করে তার ঘরে ঢুকলো। আমিও নিজের ঘরের দিকে চললাম। ঘরে ঢুকতেই মা বলল, তোর বাবার ট্রানস্ফার হয়ে গেছে--আমরা উড়িষ্যা ছেড়ে মধ্যপ্রদেশে যাব। আমি বসে গেলাম, নিজের কথা ছেড়ে সর্বানিদির কথাই মনে পড়ল। দিদির কি হবে, আমি জানতেও পারব না। দিদি আর অনির্বাণদার বিয়ে হবে। আমি দেখতে পাবো না। পরদিন দিদিকে বললাম, দিদি তোমাকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। দিদিকে আজ সাদা শাড়িতে মা সরস্বতীর মত লাগছে কিন্তু মুখটা গম্ভীর তবুও খুব সুন্দর লাগছে। আমি বললাম, আমরা মধ্যপ্রদেশে যাচ্ছি--বাবা ট্রানস্ফার হয়ে গেছে-- 

আমার কথা শুনে দিদির মুখটা শুকিয়ে গেল, বলল, আমাকে ছেড়ে যাস না--আমি একা হয়ে যাব রে! 

আমি বললাম, আমি কি করবো বলো, আমাকে তো যেতেই হবে--আমার নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছিল। হঠাৎ দেখতে পেলাম  অনির্বাণদা ছুটতে ছুটতে আসছে--হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বললো, সর্বানি, আমার মা বোন ঘাটশিলায় থাকে--তাই আমি সেখানে ট্রান্সফারের জন্য আবেদন করেছিলাম--হেড অফিস আমায ট্রান্সফার মঞ্জুর করে দিয়েছে-- 

দিদি অনেক সময় অনির্বাণের  দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকলো। দিদির মাথায় যেন বাজ পড়েছে, তার চোখের জল আটকে রাখতে পারল না, চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, অনির্বাণ আজ তোমাকে সব বলবো বলেই ভেবে ছিলাম। দিদি বলে চলল, আমি কি করে বুঝাবো জানি না, অনির্বাণ, তুমি আমাকে ভুল বুঝছো। 

আমি এমন একটা পাতকি, আমার জন্মের পর বাবা লোকজন কাউকে মুখ দেখাতে পারবে না বলে চলে আসে এই জঙ্গলে। ঠাকুমা বলেছিল, ওকে দন্ডক বনে, সীতা মায়ের দেশে নির্বাসন দিয়ে আয়। ওরা পারেনি আমাকে ছেড়ে যেতে। বাবা-মা ভয়ে অন্য কোন সন্তানের মুখ দেখেনি যাতে আমাকে নিয়ে খুব কষ্ট পেতে হয়। অনির্বাণ, তুমি যা ভাবছো আমি তা নই, আমি না স্ত্রী, না পুরুষ, এটুকু বলে দিদি হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলl দিদি আর কথা বলতে পারছিল না। আমিও কাঁদছি । 

হঠাৎ অনির্বাণদা বলল, সর্বানী, আমি তোমাকে না জেনে কষ্ট দিয়েছি। আমি বুঝতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করো--দাদা আর দাঁড়ালো না, চোখে জল নিয়ে ঘরের দিকে হাঁটতে থাকল।

আমরা ঘরে ফিরে গেলাম। সেই থেকে দিদি আর স্কুলে যেত না। আমরা মধ্যপ্রদেশে চলে গেলাম। পরে একবার উড়িষ্যায় গিয়েছিলাম দিদিকে দেখবো বলে। দিদিকে দেখতে পাইনি, হয়ত ওরাও কোথাও চলে গেছে। 

উদাস মনে ফিরে এসেছিলাম সে দিন। আজও জানি না, অনির্বাণদা আর সর্বানিদি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। 

সমাপ্ত


1 comment:

tapaskiran ray said...

ভাষা ভাব সহজ সরল। আর এ কারণেই বোধহয় গল্পটা মনোগ্রাহী লেগেছে। আমাদের দৈনন্দিন গল্পের মত তুলে ধরা হলেও এটি একটি ব্যতিক্রমী কাহিনীর গল্প। সুখপাঠ্য সন্দেহ নেই।

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

                                                     ওগো কাঙাল আমার                                   ********...