তমা কর্মকার
এক অজানা বিকেলে হঠাৎই দেখা হয়েছিল তন্ময়ের সাথে, পুরীর সমুদ্রতটে। আমি বালুকা বেলায় একা বসে দূর থেকে ভেসে আসা সমুদ্রের ঢেউ গুনছিলাম আনমনে, এমন সময় আমার সামনে এসে দাঁড়ালো তন্ময়। মুহূর্তে আমার চোখ সমুদ্রের দিক থেকে সরে গেলো তন্ময়ের দিকে, ওকে ওখানে দেখে একটু চমকে গেলাম, ওকে দেখার পর হঠাৎ অজানা মনের নিমন্ত্রণে চলে গেলাম অতীতের পথে। ও ঠোঁটের কোণে একটু হেসে বললো, কেমন আছো সাথী? চিনতে পেরেছো আমায়?
আমি ওর কথায় ওকে সামনে দেখে ভূত দেখার মত চমকে গেলাম, নিজের সম্বিৎ ফেরাতে নিজের হাতে নিজে জোরে একটা চিমটি কাটলাম, তারপর নিজেই উফ করে উঠলাম। আমি সামনে ওকে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, একি আমি স্বপ্ন দেখছি নাকি সত্যি ! ওপাশ থেকে তন্ময় বলে উঠলো, কি হলো? চিনতে পারছো না নাকি, ভুলে গেছো আমায়?
আমি মাথা নেড়ে বললাম, না, মুখে কোনো উত্তর দিলাম না শুধু অবাক চোখে ওকে দেখছিলাম, ও আবারো আমায় প্রশ্ন করলো, কি হল আমায় চিনতে পারলে নাকি ভুলে গেছো?
এবার আমি আস্তে আস্তে বললাম, না তোমায় আমি ভুলিনি, তবে তোমায় বন্ধী করেছি আমার ফেলে আসা অতীতের তাজ মহলে, বর্তমানের ছায়া পথে যার কোনো অস্তিত্ব নেই--
তন্ময় আমার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো, বলল, সাথী তোমার রাগটা কিন্তু ঠিক আগের মতই আছে, রাগলে কিন্তু আগের মতোই তোমাকে সুন্দরী লাগে--
আমি ওর এই কথার জবাব দিলাম না--শুধু সমুদ্রের দিকে নিস্পলক চোখে চেয়ে রইলাম| ও আবার বলে উঠলো, কি স্বামীর সাথে বেড়াতে এসেছো বুঝি ?
আমি ওর কথায় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললাম, হ্যাঁ|
ও আর কিছু বলল না, আমি ওকে বললাম, তুমিও বুঝি তোমার বউ নিয়ে বেড়াতে এসোছো? তা তোমার বউ কোথায়?
ও বলল, আছে কোথাও ধারে পিঠে--
আমি বললাম, তা বৌকে একা ছেড়ে এখানে আমার কাছে কি করছো? যাও ওদিকে--
ও মুখটা নিচু করে বলল, ও আছে ওর মত--
আমি বললাম, মানে?
ও বলল, সে অনেক কথা, একদিন একান্তে অবসরে বলবো।
আমি বললাম, ঐ তোমার এক দোষ, সময়ের কাজ কোনো দিনই সময়ে করতে পারো না, যাক তবে কেমন আছো ? নিশ্চয়ই খুব সুখী হয়েছো। তা ছেলে মেয়ে কটি ?
তন্ময় আমার কথার কোন উত্তর না দিয়ে এবারো শুধুই একটু মুচকি হাসলে, আমি ওর উত্তর না পেয়ে ওর ঠোঁটের কোণে হাসি দেখে কপট রেগে বোধকরি একটু জোরেই বললাম, হাসির কি হল? উত্তর নেই কেনো?
হঠাৎ পিছন থেকে দিদিভাই আমায় ধাক্কা দিয়ে বলল একা একা এই পড়ন্ত বিকেলে সমুদ্রের তীরে বসে কার সাথে কথা বলছিস? সমুদ্রের সাথে ?
আমি দিদিভাইকে বললাম, তন্ময়ের সাথে, দিদিভাই আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুটা সময় তারপর বলল কোথায় তন্ময়?কেউ কোথাও নেই !
আমি ওকে বললাম, হ্যাঁ রে দিদি, এখানেই এই মাত্র দাঁড়িয়ে ছিল আমার সাথে কথা বলছিল। মনে হয় তোকে দেখে চলে গেছে, আর জানিস তো তন্ময় এখানে এসেছে বৌকে নিয়ে বেড়াতে।
দিদি অতি বিস্ময় কাটিয়ে বলল, অসম্ভব, আমি চারিদিকে ভালো করে চোখ বুলিয়ে মুহূর্তে চলে যাওয়া তন্ময়কে খুঁজতে খুঁজতে দিদিকে প্রশ্ন করলাম, কেনো? অসম্ভব কেনো? আমরা বেড়াতে আসতে পারি আর ও আসতে পারে না?
দিদি তখন আস্তে আস্তে বলল, তোকে একটা অতি গোপন কথা বলা হয়নি, তাহল ? তন্ময় পুরীর সমুদ্র সৈকতেই একটি বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে চার বছর আগে মারা গেছে ও যেহেতু অফিসের কাজে অফিস থেকে এসে ছিল, তাই ব্যাপারটা নিয়ে পেপারে বিস্তর লেখালেখি হয়েছিল, তোর কাছেও এসে ছিল, তন্ময়ের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে টেলিগ্রাম আমরা সেটা নিয়ে ছিলাম আর তোকে বাঁচাতে তোকে কিছুই জানাইনি বা জানতে দিইনি বাড়ির পেপার দিয়েছিলাম বন্ধ করে আর তোর বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করতে তোকে শুধু একটা মিথ্যে কথা বলেছিলাম যে তন্ময় তোকে ঠকিয়েছে আর তোকে ঠকিয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে বিদেশে চলে গেছে ওর বউ নিয়ে,এই কথাটা আসলে সত্যি ছিল না, আর তুই যেহেতু আমি অন্ত প্রাণ ছিলি আমার সমস্ত কথা যাচাই না করে বিশ্বাস করতিস তাই বাবার নির্দেশে তোকে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম। পারলে এই চরম সত্যিটা লুকোবার জন্য আমায় ক্ষমা করিস, দিদি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলি বলে একটু থামলো।
আমি অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দিদির মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলাম আর ভাবতে লাগলাম কোনটা সত্যি আমার দেখা নাকি আমার শোনা?
সূর্য তার প্রতিশ্রুতি মতো দিনের সবটুকু আলো আকাশের বুকে ঢেলে রক্তিম আলোয় নিজে সেজে গোধূলিকে বিদায় জানিয়ে সুখে নিদ্রা গেলো নিদ্রা দেবীর কোলে। আমি আলো আঁধারীর আঁধারে বসে রইলাম নিথর হয়ে।
No comments:
Post a Comment