ভালোবাসায় হার মানেনি
শমিত কর্মকার
প্রফুল্ল বাবু আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ওপার বাংলা থেকে এপার বাংলায় চলে আসে। বহু ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটান। এরপর তিনি দারিদ্রের মধ্যে পড়াশোনা করেন এবং তার সুবাদে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পান। সেই সময় ঐ স্কুলেরই এক শিক্ষিকা কে ভালোবেসে ফেলেন এবং তাকে বিয়ে করেন। বর্তমানে কলকাতার নিকটেই মধ্যমগ্রামে একটি বাড়ি বানিয়েছেন অবসর গ্রহণের পর।
প্রফুল্ল সরকার তার এক কাকার সাথে বর্তমানে পশ্চিম বঙ্গের বারাসতে চলে আসেন। সেই সময় যে অবস্থা ছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে তার বাবা কাকার সাথে এপার বাংলায় পাঠিয়ে দেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে সেই বড় ছিল। কুমিল্লা জেলার একটি গ্রামে তার বাড়ি একান্নবর্তী পরিবারে তার বোন কে নিয়ে মা বাবা থাকতেন। সেই সময় যে অবস্থা ছিল একরকম বাধ্য হয়ে এখানে চলে আসে। বারাসতে এসে এক আত্মীয়ের বাড়িতে সে আর তার কাকা ওঠে। সেখান থেকেই তার সংগ্রামী জীবন। প্রথম প্রথম ভেবেছে আবার দেশে চলে যাই, আর এতো কষ্ট ভালো লাগে না। পরে অবশ্য নিজেকে সামলে জীবন শুরু করেন। কাকা এসে একটি মুদিখানার দোকানে কাজ করতে থাকে। তার স্বল্প আয়ে দুজনার ঠিক চলে না। তার উপর অন্যের বাড়ি থাকা। এই আয় নিয়েই কাকা একটি স্কুলে ভর্তি করে প্রফুল্লকে। দিন দিন অভাব বাড়তে থাকায় সে নিজেই খোঁজ করে কাগজের ঠোঙা বানানোর কাজ নিয়ে আসে। স্কুল থেকে এসে সে এই ঠোঙা বানাত।
প্রফুল্ল ও তাঁর কাকা এখন একটি ভাড়া বাড়ি তে থাকে। কাকা বিয়ে থা করেনি বলে দুজনের পয়সা দিয়ে সংসার চলে যায়। ধীরে ধীরে প্রফুল্ল মাধ্যমিক পাশ করল। এরপর তার কাকা পয়সা জমিয়ে একটি সাইকেল কিনে দিল। সংসারে পয়সার অভাব বলে প্রফুল্ল ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বাড়ি গিয়ে পড়াতে শুরু করল। এর মধ্যেই পড়াশোনা চালাতে লাগলো। বারো ক্লাস পাশ করে যখন কলেজে পড়ছে তখন শুনলো তার বাড়ি থেকে দু কিলোমিটার দূরে একটি প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। নূন্যতম যোগ্যতা মাধ্যমিক পাশ। খবর পেয়ে প্রফুল্ল সেই স্কুলে গিয়ে জানতে পারলো আগামী সপ্তাহে পরীক্ষা হবে ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ দিন কালকে। সে ফর্ম নিয়ে এসে পরদিন জমাও দিয়ে এলো।
প্রফুল্লর মাধ্যমিকে ভালো নম্বর আর ভালো পরীক্ষা দেওয়ায় স্কুলে চাকরিটা হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে বেশি সময় লাগে না। সকালে স্কুল, দুপুরে বাড়ি ফিরে যায়। কাককে মুদিখানার থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছে । যে ভাড়া বাড়িতে ছিল সেটা ছেড়ে অন্য একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছে।
প্রফুল্ল বাড়ি ফিরে কাকা আর নিজের জন্য রান্না করে নেয়। আর কিছু করতে হবে বলে সন্ধ্যায় কিছু টিউশন করে। কাকার বয়স হয়েছে বলে কিছু করতে দেয় না। কাকাও তাকে ভীষণ ভালোবাসে। মাঝেমধ্যে প্রফুল্ল এর সাথে গল্প করে আর বলে তাদের সংগ্রামের কথা।
প্রফুল্ল সরকার, জাতে কায়স্থ। স্কুলে পড়াতে পড়াতে ঐ স্কুলের এক দিদিমনির সাথে তার ভালোবাসা জন্মায়। তিনি জাতে ছিলেন বাহ্মণ। বেশ কিছু দিন পর যখন তারা স্থির করল যে তারা বিয়ে করে সংসার পাতবে তখন শুরু হলো ঝামেলা।
মেয়ের পরিবার যখন জানতে পারল তখন বেঁকে বসল। এই ছেলের সাথে তাদের মেয়েকে কিছুতেই বিয়ে দেবে না। ওদিকে প্রফুল্লর জিদ সে ওকেই বিয়ে করবে। মেয়ের বাড়ি থেকে মেয়েকে বলে দেওয়া হলো যদি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করতে হয় তবে তারা দেবে না। মেয়েও নাছোড়বান্দা সে প্রফুল্লকে ছাড়া বিয়ে করবে না।
সব শুনে প্রফুল্লর কাকা বলল, আমি যখন আছি এই বিয়ে হবেই। আগামী সপ্তাহে বিয়ের দিন আছে ঐ তারিখে তোর আমি বিয়ে দেবো। তুই আমাকে তার সাথে কথা বলা। কাকার কথা মতো প্রফুল্ল পরদিন স্কুলে নিয়ে গেল। তার কাকা স্কুলেরই একটি জায়গায় বসে থাকল। টিফিনের সময় প্রফুল্ল তার সেই দিদিমনি পাত্রীকে সাথে করে কাকার কাছে নিয়ে এলো। কাকার সাথে প্রফুল্ল দিদিমনি মানে পর্না মুখার্জীর পরিচয় করিয়ে দিল।কাকা এর পর দুজনের সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে সব জানলো। সবশেষে কাকাই তাদের ভরসা দিল এই বিয়ে সেই দেবে কোন কিছু ভয়ের নেই।
প্রফুল্লর বিয়ে হয়ে গেছে প্রায় মাস খানেক হল। কাকাই সব আয়োজন করে তাদের বিয়ে দিয়েছেন। অনেক ঝামেলা ঝঞ্ঝাটের পর মেয়ের বাড়ির লোকেরা তাদের মেয়ে মানে পর্না কে ঘরে নিয়েছে। প্রফুল্ল ও তাদের বাড়ি মানে শশুর বাড়ি গিয়েছে।
কাকা মারা গেছে বেশ কিছু দিন হয়ে গেল। বয়স জনিত অসুখে ভুগছিলেন। প্রফুল্লর চাকরিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । পর্না ও প্রফুল্লর একটি ছেলে মাষ্টার ডিগ্রি করছে। নিজেদের কোন বাড়ি ছিল না বলে প্রফুল্ল দুকাঠা জমি মধ্যমগ্রামে কিনে রেখেছিল।
প্রফুল্ল আজ মনে মনে ভাবে তার জীবনের বিভিন্ন কথা। তার এদেশে আসার পর থেকে বিভিন্ন সময়ের সংগ্রামের কথা। প্রতি পদক্ষেপেই তাকে সংগ্ৰাম করতে হয়েছে। তবুও সে হারেনি। বিশেষ করে তার জীবনের ভালোবাসার দিকটিকে নিয়ে সে কোন রকম সমঝোতা করেনি।অবসরের পর মধ্যমগ্রাম এর বাড়িতে চলে এসেছে প্রফুল্ল। আর তার সেখানেই বসে এই সব ভাবা।
*****
No comments:
Post a Comment